সিদ্ধান্ত নিতে আটকে আছেন? কাগজে লিখে মেপে দেখুন
একটা সিদ্ধান্ত মাথার ভেতর ঘুরতেই থাকলে, লিখে ফেলা সাহায্য করে। লাভ-ক্ষতির তালিকা দেখায় প্রতিটি বিকল্প আপনাকে আসলে কী দেয় আর কী কেড়ে নেয়, অল্প সময়ে আর দীর্ঘ সময়ে। সমস্যা সমাধান সিদ্ধান্তটাকে ধাপে ভাঙে: সমস্যাটা নির্দিষ্ট করা, বিকল্পের তালিকা, সেগুলো মেপে দেখা, একটা বেছে নিয়ে পরিকল্পনা করা। প্রায়ই কোনো বিকল্পই নিখুঁত নয়; লক্ষ্য হলো এমন একটা মোটামুটি ভালো সিদ্ধান্ত যা নিয়ে কাজ করা যায়।
মূল কথা
- মাথার ভেতর সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাবলে তা সাধারণত ঘুরপাক খায়; কাগজে সবকিছু একসাথে দেখা যায়।
- প্রতিটি বিকল্প এখন আর পরে কী দেয় আর কী কেড়ে নেয় তার তালিকা প্রায়ই দেখায় কোনটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
- সব-অথবা-কিছুই-না চিন্তা আপনাকে এমন এক নিখুঁত বিকল্পের অপেক্ষায় রাখতে পারে যা আসলে নেই।
- একেবারে সিদ্ধান্ত না নেওয়ার চেয়ে বেছে নেওয়া, চেষ্টা করা আর বদলে নেওয়া সাধারণত ভালো।
কিছু সিদ্ধান্ত অসম্ভব মনে হয় কেন?
নতুন চাকরিটা নেব, নাকি যেখানে আছি সেখানেই থাকব? বড় ফ্ল্যাটে উঠব, নাকি টাকা জমানো চালিয়ে যাব? বন্ধুকে মনের কথা বলব, নাকি ছেড়ে দেব? কিছু সিদ্ধান্ত সপ্তাহের পর সপ্তাহ ঘুরতেই থাকে। মনে হয় ঠিক করে ফেলেছেন, তারপর নতুন একটা দুশ্চিন্তা উঁকি দেয় আর আপনি আবার শুরুর জায়গায়।
এমন হওয়ার কয়েকটা কারণ আছে। একসাথে কয়েকটা বিকল্প আর তাদের সব ভালো-মন্দ মাথায় ধরে রাখা কঠিন; মন সাধারণত সেই মুহূর্তে যে দুশ্চিন্তার আওয়াজ সবচেয়ে বেশি, সেটার ওপরেই আটকে থাকে। বড় সিদ্ধান্তে অনিশ্চয়তাও থাকে, আর উদ্বিগ্ন চিন্তা অনিশ্চয়তা একদম সহ্য করতে পারে না। আর দুটো চিন্তার ফাঁদ আছে যা মানুষকে সাধারণত আটকে রাখে।
সব-অথবা-কিছুই-না চিন্তা বলে একটা বিকল্প হয় নিখুঁত, নয়তো বাজে। কোনো বিকল্পই নিখুঁত নয় বলে কিছুই ঠিক মনে হয় না। ভবিষ্যদ্বাণী করা আগাম বলে দেয় প্রতিটি সিদ্ধান্ত কেমন দাঁড়াবে, সাধারণত খারাপ, যেন আগে থেকেই জানা সম্ভব। “চাকরিটা নিলে আমার খারাপ লাগবে।” “থেকে গেলে সারাজীবন আফসোস করব।”
লিখে ফেললে কেন সাহায্য হয়?
কাগজে আপনি একসাথে প্রতিটি বিকল্প আর প্রতিটি বিবেচনা দেখতে পান। এটাও খেয়াল করতে পারেন কখন একটা দুশ্চিন্তাকে তার প্রাপ্যের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছিলেন, বা কখন দুটো বিকল্প আসলে যতটা মনে হয়েছিল তার চেয়ে কাছাকাছি।
এর জন্য দুটো সহজ সিবিটি টুল আছে: লাভ-ক্ষতির তালিকা, যা খুঁটিয়ে দেখে প্রতিটি বিকল্প কী দেয় আর কী কেড়ে নেয়, আর সমস্যা সমাধান, যা একটা সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে আপনাকে ধাপে ধাপে নিয়ে যায়।
লাভ-ক্ষতির তালিকা কীভাবে করব?
কয়েকটা বিকল্পের মধ্যে বেছে নিতে, বা এমন কোনো অভ্যাস বা বিশ্বাস নিয়ে যা রাখবেন কি না নিশ্চিত নন, লাভ-ক্ষতির তালিকা সাহায্য করতে পারে।
- বিকল্পটার নাম দিন। “নতুন চাকরিটা নেওয়া।”
- এর দিকে কতটা ঝুঁকছেন তার রেটিং দিন, ০ থেকে ১০০%-এর মধ্যে।
- এটা আপনাকে কী দেয় তার তালিকা করুন। এখন আর পরে, আপনার আর আপনার চারপাশের মানুষদের কথা ভাবুন।
- এটা কী কেড়ে নেয় তার তালিকা করুন। একইভাবে: এখন আর পরে, আপনি আর অন্যরা।
- সিদ্ধান্ত নিন, আর আবার রেটিং দিন।
প্রতিটি বিকল্পের জন্য একটা করে তালিকা করা কাজে আসতে পারে, “যেমন আছি তেমন থাকা”-সহ। সিদ্ধান্ত না নেওয়াও একটা সিদ্ধান্ত, যার নিজের লাভ আর ক্ষতি আছে।
লাভ-ক্ষতির হিসাব অনুশীলন একবারে একটি প্রশ্ন করে তালিকাগুলো তৈরি করায়।
বাস্তবে এটা দেখতে কেমন?
একটা বানানো উদাহরণ। দেবাশিস অন্য একটা কোম্পানি থেকে চাকরির প্রস্তাব পেয়েছেন।
- বিকল্প: নতুন চাকরিটা নেওয়া। এর দিকে ঝোঁক: ৫০%।
- এটা আমাকে কী দেয়: “বেশি মাইনে। যাতায়াতে কম সময়। নতুন কিছু শেখার সুযোগ। এমন একজন ম্যানেজারের থেকে সরে আসা যাঁর সাথে আমার কাজ করা কঠিন।”
- এটা কী কেড়ে নেয়: “পছন্দের সহকর্মীদের ছেড়ে যাওয়া। যেখানে কেউ আমাকে চেনে না সেখানে আবার শুরু করা। ঠিকঠাক না হলে কিছুটা ঝুঁকি।”
- যেমন আছি তেমন থাকা, এটা আমাকে কী দেয়: “কাজটা আর লোকজন আমার চেনা। নিরাপদ।”
- যেমন আছি তেমন থাকা, এটা কী কেড়ে নেয়: “আমার একঘেয়ে লাগে, আর ম্যানেজার বেশির ভাগ সপ্তাহেই আমাকে উদ্বিগ্ন করে রাখেন। যাতায়াতে দিনে দুই ঘণ্টা যায়।”
- এখন নতুন চাকরির দিকে ঝোঁক: ৭০%।
লিখতে গিয়ে দেবাশিস খেয়াল করেন, নতুন চাকরির বেশির ভাগ ক্ষতি প্রথম কয়েক মাস নিয়ে, অথচ থেকে যাওয়ার ক্ষতিগুলো প্রতি সপ্তাহের, অনির্দিষ্ট কাল ধরে। এতে তাঁর হয়ে সিদ্ধান্ত হয়ে যায় না, কিন্তু ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়।
তবুও যদি সিদ্ধান্ত নিতে না পারি?
সিদ্ধান্ত জটিল হলে, সমস্যা সমাধান একে ছোট ছোট ধাপে ভাঙে:
- সমস্যাটা স্পষ্ট করে নির্দিষ্ট করুন। “আমার জীবন এলোমেলো” নয়, বরং “শুক্রবারের মধ্যে চাকরির প্রস্তাব নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে”।
- প্রতিটি বিকল্পের তালিকা করুন, এখনই বিচার না করে। অদ্ভুতগুলোও রাখুন।
- প্রধান বিকল্পগুলো মেপে দেখুন, প্রতিটির জন্য একটা লাভ-ক্ষতির তালিকা দিয়ে।
- একটা বেছে নিন, নিখুঁত না হলেও।
- প্রথম পদক্ষেপের পরিকল্পনা করুন। “চুক্তি নিয়ে আমার প্রশ্নগুলো এইচআর-কে ইমেল করব।”
- কেমন গেল তা ফিরে দেখুন আর দরকার হলে বদলে নিন।
সমস্যা সমাধান অনুশীলন এই ধাপগুলোর মধ্য দিয়ে নিয়ে যায়।
শেষে কী দাঁড়াবে না জেনে কীভাবে থাকব?
যত ভাবনাই করুন, একটা সিদ্ধান্ত ঠিক কীভাবে গড়াবে তা কেউ বলতে পারে না। বেশির ভাগ সিদ্ধান্ত অসম্পূর্ণ তথ্য নিয়েই নেওয়া হয়, আর এটা স্বাভাবিক। কয়েকটা ভাবনা সাহায্য করতে পারে:
- মোটামুটি ভালোই যথেষ্ট। আপনি একটা যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত খুঁজছেন, নিখুঁতটা নয়।
- বেশির ভাগ সিদ্ধান্ত পরে বদলে নেওয়া যায়। নতুন চাকরিটা ঠিকঠাক না হলে, তখনও আপনার সামনে বিকল্প থাকবে।
- একটা সময়সীমা ঠিক করুন। “রবিবার সন্ধ্যার মধ্যে ঠিক করব”, এতে চক্রটা অনন্তকাল চলে না।
- আপনার মূল্যবোধ খেয়াল করুন। তালিকাগুলো সমান সমান হলে জিজ্ঞেস করুন, কোন বিকল্পটা আপনার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলোর সাথে বেশি মেলে।
সিদ্ধান্তে যদি অন্য কেউ জড়িত থাকেন?
অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত অন্য মানুষদের ওপর প্রভাব ফেলে: জীবনসঙ্গী, সন্তান, বন্ধু, সহকর্মী। তালিকাগুলো একসাথে করা, বা অন্যজনকে জিজ্ঞেস করা যে প্রতিটি শিরোনামের নিচে তিনি কী লিখতেন, কাজে আসতে পারে। হয়তো দেখবেন ওঁরা কী চান তা আন্দাজ করে চলছিলেন, আর আসল উত্তরটা ভাবার চেয়ে সহজ। যেখানে মতের অমিল, সেখানে অন্তত তালিকাগুলো দেখায় আপনারা প্রত্যেকে কী নিয়ে ভাবেন, যা একা একা ঘুরপাক খাওয়ার চেয়ে ভালো শুরু।
কখন কারও সাথে কথা বলা উচিত?
যদি ছোট ছোট সিদ্ধান্ত নিতেও কঠিন লাগে, যদি সিদ্ধান্ত নিয়ে দুশ্চিন্তা আপনাকে রোজকার কাজ করা থেকে আটকে দেয়, বা যদি বেশির ভাগ দিন মন খারাপ বা দিশেহারা লাগে, অনুগ্রহ করে আপনার ডাক্তার বা কোনো মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলুন। আপনি যদি এখন বিপদে থাকেন, আপনার স্থানীয় জরুরি নম্বরে কল করুন।
চেষ্টা করুন
শীঘ্রই App Store-এ: জানুয়ারি ২০২৭
সূত্র
- D'Zurilla, T. J., & Goldfried, M. R. (1971). Problem solving and behavior modification. Journal of Abnormal Psychology, 78(1), 107–126.
- Greenberger, D., & Padesky, C. A. (2015). Mind Over Mood (2nd ed.). Guilford Press.
- Problem solving. Every Mind Matters, NHS.
কোনো লেখা প্রকাশের আগে একজন মানুষ প্রতিটি সূত্র খুলে যাচাই করেন।